এক আমলে ৫৩ দিন গুম
নিজ দেশে ‘অনুপ্রবেশের’ হাস্যকর অভিযোগে গ্রেফতার-মামলা-জেল জুলুম!
এই আমলে ভিটেমাটি দখলের চেষ্টা!
অনলাইন ডেস্ক: মেহেরপুর শহরে প্রখ্যাত ফটোসাংবাদিক ও সাপ্তাহিক ‘পক্ষকাল’-এর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলের পৈতৃক ভিটেমাটি দখলের চেষ্টা এবং পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মেহেরপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ হামিদ সড়কের ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে একদল ব্যক্তি এই দখলচেষ্টা চালাচ্ছে বলে সাংবাদিক কাজলের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১১ জুন ওই বাড়ির প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। এর কয়েক মাস পর, গত ১০ অক্টোবর বাড়ির আঙিনায় থাকা সাংবাদিক কাজলের মায়ের স্মৃতিবিজড়িত একাধিক বড় নারকেলগাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ও দখলচেষ্টা
সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ও তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম শাহিন বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। বাড়িতে তাঁদের বিধবা বোন একাকী বসবাস করার সুযোগ নিয়ে এই পৈতৃক সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালানো হচ্ছে。 গত জুনে সীমানাপ্রাচীর ভাঙার সময় বাধা দিলে তাঁর বোনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে কাজল জানান।
সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ও তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম শাহিন বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। বাড়িতে তাঁদের বিধবা বোন একাকী বসবাস করার সুযোগ নিয়ে এই পৈতৃক সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালানো হচ্ছে。 গত জুনে সীমানাপ্রাচীর ভাঙার সময় বাধা দিলে তাঁর বোনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে কাজল জানান।
এই ঘটনায় আব্দুল করিম ওরফে গুডু, মতিউর রহমান, বিল্টু, মন্টু এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সঙ্গে অভিযুক্তদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই তাঁরা এই ঘটনা ঘটাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। তবে এই বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বা বিএনপি নেতার আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোয় সাংবাদিক কাজলের ২০২০ সালের ‘গুম’ প্রসঙ্গ
পৈতৃক সম্পত্তি দখলের এই সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে সাংবাদিক কাজলের অতীতের রাষ্ট্রীয় ও আইনি নিপীড়নের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি গার্ডিয়ান-এর The Guardian এক বিশেষ প্রতিবেদনে ২০২০ সালে তাঁর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ও কারাবরণের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।
- ৫৩ দিনের রহস্যময় অন্তর্ধান: ২০২০ সালের ১০ মার্চ রাজধানী ঢাকা থেকে শফিকুল ইসলাম কাজল আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনজন অজ্ঞাত ব্যক্তি কাজলের মোটরবাইকে কিছু একটা নিয়ে কারসাজি করছিল। নিখোঁজের দীর্ঘ ৫৩ দিন পর, ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে ভারতের সীমান্তবর্তী একটি শহরে (বেনাপোল) তাঁকে পুলিশ হেফাজতে পাওয়া যায়।
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিপীড়ন: নিখোঁজ হওয়ার ঠিক একদিন আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক নেতার পক্ষ থেকে কাজলের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ (DSA)-এর অধীনে মামলা করা হয়েছিল। শাসক দলের এক নারী নেত্রীর যৌন পাচার চক্র পরিচালনার সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট শেয়ার করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা হয়। এই আইনের অধীনে তাঁর সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকি ছিল। সীমান্তে তাঁকে পাওয়ার পর অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বিতর্কিত ইন্টারনেট আইনের অধীনে তাঁকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়।
- পরিবারের আকুতি ও কোভিড-১৯ আতঙ্ক: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) কাজলের এই রহস্যজনক অপহরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছিল। সে সময় বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির (Covid-19) প্রকোপ চলায় বাংলাদেশের জনাকীর্ণ কারাগারে কাজলের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে তাঁর ছেলে মনোরোম পলক এবং পুরো পরিবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজলের মুক্তির দাবিতে ৩০০-র বেশি বিশিষ্ট নাগরিক আন্দোলনে নামেন।
পুলিশের ভূমিকা ও বিগত সরকারের আমলের হামলা
পৈতৃক বাড়ি ভাঙচুর ও গাছ কাটার সাম্প্রতিক ঘটনাটি মেহেরপুর জেলা পুলিশের একজন সহকারী পুলিশ সুপারকে মুঠোফোনে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে এরপরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘটনাটির বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত মামলা দায়ের হয়েছে কি না বা পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাংবাদিক কাজলের দাবি অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও মেহেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মোতাসিম বিল্লাহ মতুর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে তাঁর পৈতৃক বাড়ি দখলের চেষ্টা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। এমনকি সে সময় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
‘প্রবাসে থাকি বলে কি পৈতৃক ভিটা দখল হয়ে যাবে?’
অতীতের গুম ও কারাবরণের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে এই পৈতৃক সম্পত্তির ওপর হামলা সাংবাদিক কাজলের পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও নিজের পরিবার ও পৈতৃক সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কাজল বলেন:
অতীতের গুম ও কারাবরণের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে এই পৈতৃক সম্পত্তির ওপর হামলা সাংবাদিক কাজলের পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও নিজের পরিবার ও পৈতৃক সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কাজল বলেন:
“আমার মায়ের হাতে লাগানো নারকেলগাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য জোর করে আমাদের জায়গা দখল করে নেওয়া। আমাদের বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ থাকে না, থানায় গিয়ে অভিযোগ করার মতো লোকও নেই।”
বিগত দিনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া এই ফটোসাংবাদিক বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর একাকী থাকা বোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পত্তি দখলচেষ্টার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।



