আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ডেস্ক
টানা তিন দিনের দরপতনের পর আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে মূল্যবান ধাতুটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদার কারণে স্বর্ণের যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসছে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই নিম্নমুখী প্রবণতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী দেশের বাজারে বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণ ও রুপার দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কী ঘটছে?
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮৮.৯৭ ডলারে নেমে এসেছে, যা জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বনিম্ন অবস্থান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ ফিউচার বাজারেও দরপতন দেখা গেছে। আগস্টে সরবরাহযোগ্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ১.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১০০.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে যায়, তাহলে বাজারে আরও বড় ধরনের সংশোধন দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৮০০ ডলার এমনকি ৩ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছিও চলে যেতে পারে।
কেন কমছে স্বর্ণের দাম?
১. ডলারের শক্তিশালী অবস্থান
বর্তমানে মার্কিন ডলারের সূচক এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং দাম নিম্নমুখী হয়।
২. ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নীতি
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরে আরও কয়েক দফা সুদহার বৃদ্ধি করতে পারে বলে বাজারে জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সুদহার বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সরকারি বন্ড ও ডলারের মতো সুদবাহী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অন্যদিকে স্বর্ণ কোনো সুদ দেয় না, ফলে এর আকর্ষণ কমে যায়।
৩. মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রভাব
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কিছুটা কমে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকিভীতি হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও স্থিতিশীলতার দিকে ফিরছে। এর ফলে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের অতিরিক্ত চাহিদা কমেছে।
বাংলাদেশের বাজারে বড় সমন্বয়
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দেশের বাজারেও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। নতুন মূল্যহারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগেও এর দাম ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা।
নতুন দরে:
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণ: ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪২ টাকা
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৮ টাকা
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৩২ টাকা
এছাড়া সব ধরনের রুপার দামও কমানো হয়েছে। নতুন দরে ২২ ক্যারেট রুপা প্রতি ভরি ৪ হাজার ৮৪১ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ২ হাজার ৯৭৪ টাকায় বিক্রি হবে।
বাজারের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, ডলারের গতিপ্রকৃতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বর্ণবাজারের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। যদি ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বৃদ্ধির পথে এগোয় এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, তাহলে স্বর্ণের দামে আরও কিছুটা সংশোধন দেখা যেতে পারে। তবে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক সংকট বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা আবারও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
বাজার পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, বর্তমান দরপতনকে স্বর্ণবাজারের একটি ‘কারেকশন ফেজ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারে।



